
ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের ৬০০ কোটি টাকা লুটের দায় স্বীকার করেছেন ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিম। ২০০৫ ও ২০০৬ সালে তিনি ওই ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকার সময় অন্তত ৩০৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা সরিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। এর মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে ২৩২ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ৭২ কোটি ১৩ লাখ টাকা সরানো হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাকি টাকা আত্মসাতের জন্য তিনি তার আপন ভাই সাবেক এমপি এবাদুল করিম ও ব্যাংকটির ওই সময়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কয়েস সামিসহ কয়েকজনকে দায়ী করেছেন।
২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্সের অভিযান চলাকালে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে ছিলেন ওবায়দুল করিম। এ সময় একটি বিশেষ সংস্থার কাছে লিখিতভাবে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে ওই সব টাকা পরিশোধ করতে যৌক্তিক সময় চান। অন্তত ৩৬ পৃষ্ঠার ওই আবেদনে পরোক্ষভাবে ৬০০ কোটি টাকা লোপাটের দায় নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনাদের সহযোগিতা পেলে এবং ওরিয়ন গ্রুপ ভবিষ্যতে এ ব্যাংকের মালিক হলে ‘থার্ড পার্টি গ্যারান্টার’ হিসেবে সব টাকা রিকভারির দায়িত্ব নেবে, যা আমি ব্যক্তিগত গ্যারান্টি হিসেবে মেনে নেব।’
বিশেষ সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদনের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় ওবায়দুল করিম বলেন, ‘১১ জানুয়ারি ২০০৭ তারিখে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের নিকট আমি শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যাংকের ওই জটিল সমস্যাটি সমাধানের জন্য আপনার মাধ্যমে আকুল আবেদন জানাই। আমি বিশ্বাস করি, যেকোনো জাতীয় দুঃসময়ে আপনাদের পক্ষেই সম্ভব এই সমস্যার একটি ন্যায়ভিত্তিক ও প্রকৃত সমাধান। যদিও সরকার আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যা সমাধানে দিনরাত্রি অত্যন্ত পরিশ্রম করছেন। তথাপি দেশের জনগুরুত্বপূর্ণ আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের সমস্যার সমাধান জরুরি। এ ব্যাপারে আপনাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।’
চতুর্থ পৃষ্ঠায় তিনি বলেন, ‘২০০৬ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট রিপোর্টে বেনামি অ্যাকাউন্ট থেকে আমার নামে সুদ-আসলসহ ৯২ কোটি টাকার (আসল ৬৪ কোটি টাকা) দায় দেখানো হয়। এ দায় আমার না হলেও আমি এর দায়িত্ব নিলাম। আমি আসলে এ দায়িত্ব নিয়েছি কয়েস সামির কাছে অবৈধভাবে রাখা ২০ কোটি টাকার শেয়ারের বিনিময়ে। আমি ভেবেছিলাম যেহেতু আমরা দেশের বেসরকারি খাতের সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ফ্লাইওভার নিজ অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছি। এতে শেয়ার মার্কেটে প্রভাব পড়বে, ফলে ওরিয়ন গ্রুপের সব শেয়ারের মূল্য বাড়বে, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি বাড়বে এবং আমি এই ৬৪ কোটি টাকার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারব।’
সপ্তম পৃষ্ঠায় বলেন, ‘ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখায় ৫১ কোটি ২৭ লাখ টাকার দায় দেখানো হয়েছে, যা আমরা ব্যাংকের মালিকানায় আসার আগে। এ ছাড়া ব্যাংকের পরিচালক এবাদুল করিমের দায় রয়েছে ২৮ কোটি ২১ লাখ। এ দায় কোনোক্রমেই আমার নয়। এবাদুল করিম এই দায় পরিশোধ করতে প্রস্তুত আছেন। অষ্টম পৃষ্ঠায় একটি ছকে ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখায় ১১টি প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৬ কোটি টাকার দায় দেখানো হয়েছে। এসবের মধ্যে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কয়েস সামি ২৮ কোটি টাকা বিতরণ করেন। ওরিয়ন গ্রুপ ব্যাংকের মালিক হলে ভবিষ্যতে থার্ড পার্টি গ্যারান্টার হিসেবে এই টাকা রিকভারির দায়িত্ব নেবে।’
দশম পৃষ্ঠায় ওবায়দুল করিম বলেন, ‘ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখার নন-ফান্ডেড ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকার দায় অবশ্যই আমার। ইতোমধ্যে ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে গ্যারান্টির বিপরীতে মার্জিন বাবদ টাকা জমা দেওয়া হচ্ছে।’
এভাবে ব্যাংকটির ৬০০ কোটি টাকা লুটপাটের মধ্যে ৩০৪ কোটি টাকার দায় ওবায়দুল করিম সরাসরি স্বীকার করেন এবং বাকি টাকার দায় পরোক্ষভাবে স্বীকার করেন। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের অন্য কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার কথাও উল্লেখ করেন।
এদিকে ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখার নন-ফান্ডেড ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে ওবায়দুল করিমের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। এই সাজা থেকে বাঁচতে নানা রকম কূটকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
সূত্র: খবরের কাগজ
সবুজ পত্র সবুজের সমারোহে বাংলাদেশ