ঋণ জালিয়াতি, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, পাচার, অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনসহ নানা অপরাধের অভিযোগে এক ডজনেরও বেশি মামলা কাঁধে নিয়ে বছরের পর বছর বহাল তবিয়তে আছেন ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিম ও তার পরিবাবের সদস্যরা। বেশ কয়েকটি মামলায় তাদের কারাদণ্ড হয়েছে। সাজা থেকে বাঁচতে মামলার নথি গায়েব, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে এবং আইনের ফাঁকফোকরে সময়ক্ষেপণ করে অপকর্মের ধারাবাহিকতা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এর মধ্যে ২০২১ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা শীর্ষ ঋণখেলাপিদের তালিকায় উঠে আসে ওবায়দুল করিমের নাম। সেই সময় তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা ঠুকেই বাঁচার চেষ্টা করেন তিনি।

জানা গেছে, ওই তালিকায় ওবায়দুল করিম ওরফে মোহাম্মদ ওবায়দুল করিমের অন্তর্ভুক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ২২ আগস্ট হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। পরদিন ২৩ আগস্ট রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ঋণখেলাপির তালিকায় ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিমের নাম অন্তর্ভুক্ত করা স্থগিত করেন হাইকোর্টের তৎকালীন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের বেঞ্চ। একই সঙ্গে তাকে ঋণখেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে চার সপ্তাহের রুল জারি করা হয়। এরপর অন্তত ৯৫টি তারিখ পরিবর্তন হয়েছে। নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সেই মামলার শুনানি হয়নি। সর্বশেষ গত ৯ মে হাইকোর্টের বিচারপতি ফারাহ্ মাহবুব ও বিচারপতি মুহাম্মদ মাহবুব উল ইসলামের বেঞ্চে শুনানি ধার্য ছিল। এরপর মামলাটি আর কোনো বেঞ্চের কার্যতালিকায় দেখা যায়নি।
২০২১ সালে আদেশের দিন শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের তৎকালীন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার বলেন, ওবায়দুল করিম ২০১২ সালে আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড থেকে কিছু শেয়ার ক্রয় দেখিয়েছিলেন (১২ দশমিক ৮ শতাংশ)। কিন্তু তিনি আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের পরিচালক নন বা প্রকাশনা দ্বারা প্রাপ্ত ঋণের গ্যারান্টার নন এবং খেলাপি হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম পরিমাণ শেয়ারের মালিকও তিনি নন।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ওবায়দুল করিমের মালিকানাধীন ওরিয়ন গ্রুপের ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে শুধু জনতা ব্যাংকেই ঋণ রয়েছে ২ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকে মোট ঋণের পরিমাণ ১৫ হাজার ১৪৫ কোটি ২২ লাখ ৫৪ হাজার ৬০৬ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অন্তত হাজার কোটি টাকা।
ঋণের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ওরিয়ন গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বেলহাসা একম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম ও তার ছেলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান ওবায়দুল করিম একটি ব্যাংক থেকে ১৬৬ কোটি ৩০ লাখ ২১ হাজার ৫০৮ টাকা ঋণ নেন। কিন্তু কোম্পানি তো দূরের কথা, টিআইএন নম্বরেরও খোঁজ মেলেনি। বেলহাসা একম জেভি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম চেয়ারম্যান, এমডি সালমান ওবায়দুল করিম ও স্পন্সর পরিচালক মাজেদ আহম্মেদ সাঈফের নামে ঋণের পরিমাণ ৭৮ কোটি ২৮ লাখ ৩৯ হাজার ৬৪৮ টাকা। ওবায়দুল করিম আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের নামে ৫১ কোটি ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৮৬৮ টাকা ঋণ নিয়েছেন। এর মধ্যে ১২ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৭১৭ টাকা পরিশোধ করেননি। এমনকি এই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা অংশীদারত্বের কোনো বৈধ কাগজ পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
কার্গো মেরিটাইম লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম এবং এমডি সালমান ওবায়দুল করিম ৪ কোটি ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৭০০ টাকা ঋণ নিয়েছেন, যা তারা পরিশোধ করেননি। ডিজিটাল পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও এমডি মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম, নমিনি পরিচালক আরজুদা করিম নুদারাত, স্পন্সর পরিচালক এস করিম ছয়টি তফসিলি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৪২৬ কোটি ৫২ লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ টাকা ঋণ নিলেও খেলাপির পরিমাণ ১ কোটি ৩৮ লাখ ৫৯ হাজার ৭০৫ টাকা। এ ছাড়া নন-ফান্ডেড ঋণ ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
ডাচ-বাংলা পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও এমডি ওবায়দুল করিম এবং প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক সালমান ওবায়দুল করিমসহ পরিবারের আরও দুই সদস্য ১০২ কোটি ৪৭ লাখ ৩৬ হাজার ৪৩০ টাকা ঋণ নিয়েছেন। এর মধ্যে ৩৯ লাখ ৯৭ হাজার ৯৭৩ টাকার ঋণ পরিশোধ করেননি। এর বাইরে ৯৪ কোটি ৩৮ লাখ ১২ হাজার ৫১০ টাকার নন-ফান্ডেড ঋণও রয়েছে।
কোহিনূর কেমিক্যালস কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম ও পরিচালক মোহাম্মদ এবাদুল করিম সরকার ৬২ কোটি ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৫০৯ টাকা ঋণ নেন। এর মধ্যে ৮৭ হাজার ৭৫০ টাকা পরিশোধ করেননি। নন-ফান্ডেড গ্যারান্টি বাবদ ব্যাংকের পাওনা ৪৯ কোটি ৬০ লাখ ৪৬ হাজার ৪০৫ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ঋণ পরিশোধ না করায় ওবায়দুল করিম ও অন্যান্য পরিচালকের ঋণখেলাপি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। কিন্তু উচ্চ আদালতে রিট করে তালিকা থেকে নাম প্রত্যাহার করানো হয়েছে।
ওরিয়ন অ্যাগ্রো প্রোডাক্ট লিমিটেডের নামে ৪৮ কোটি ১৬ লাখ ৭ হাজার ৭১৫ টাকা ঋণ নেওয়া হয়। ওরিয়ন ফুটওয়্যার লিমিটেডের নামে ১৬ কোটি ২০ লাখ ৫৬ হাজার ৮৭২ টাকা ঋণ নিয়ে ১৫ লাখ ৪২ হাজার ১৭৮ টাকা পরিশোধ করা হয়নি। ওরিয়ন গ্যাস লিমিটেডের নামে ৪৮৯ কোটি ৬ লাখ ২৬ হাজার ৩৫৫ টাকা ঋণ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৪৭ কোটি ৯৭ লাখ ২১ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেনি। এ ছাড়া নন-ফান্ডেড ঋণ রয়েছে ৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৩১ হাজার ৫৪৬ টাকা। ওরিয়ন হোম অ্যাপ্লায়েন্স লিমিটেডের নামে ঋণ রয়েছে ৩৩৪ কোটি ১০ লাখ ৭ হাজার ৫৬৪ টাকা।
ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের নামে ঋণ রয়েছে ৪২১ কোটি ৮৫ লাখ ৯৪ হাজার ৮৯৪ টাকা। ওরিয়ন নিট টেক্সটাইল লিমিটেডের নামে ২২৫ কোটি ৮৫ লাখ ৩৫ হাজার ২৬ টাকা ঋণ নিয়ে ২০ কোটি ৮২ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৯ টাকা পরিশোধ করা হয়নি। ওরিয়ন অয়েল অ্যান্ড শিপিং লিমিটেডের নামে ২ হাজার ৫৩৬ কোটি ৬৩ লাখ ৫৮ হাজার ২১৪ টাকা ঋণ নিয়ে ৪০৩ কোটি ৯৯ লাখ ২ হাজার ৮৫৬ টাকা পরিশোধ করা হয়নি। নন-ফান্ডেড ঋণ রয়েছে ৪৭৪ কোটি ১৯ লাখ ৮৪ হাজার ২১ টাকা। ওরিয়ন ফার্মা লিমিটেডের ঋণ ২ হাজার ২২৮ কোটি ৬১ লাখ ৯ হাজার ৫৮৭ টাকা। এর মধ্যে ১২৮ কোটি ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার ৩৪১ টাকা পরিশোধ হয়নি। সন্দেহজনক ঋণ ১০১ কোটি ১১ লাখ ৯০ হাজার ৭৫১ টাকা।
ওরিয়ন পাওয়ার রূপসা লিমিটেডের ঋণ ৬৯৭ কোটি ৫২ লাখ ৩২ হাজার ২৩০ টাকা। এর মধ্যে ৫০ কোটি ৬৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ হয়নি। এর বাইরে নন-ফান্ডেড ঋণ হিসেবে ব্যাংকের পাওনা ২২ কোটি ১৩ লাখ ৫৯ হাজার ৩৬০ টাকা। ওরিয়ন পাওয়ার লিমিটেডের ঋণ ১ হাজার ৬ কোটি ৭৮ লাখ ৭৪ হাজার ৭১৮ টাকা। এর মধ্যে ১৩২ কোটি ১২ লাখ টাকা পরিশোধ হয়নি। ওরিয়ন পাওয়ার ইউনিট-২ ঢাকা লিমিটেডের ১ হাজার ৫৪ কোটি ২৬ লাখ ৯১ হাজার ৪৫৬ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এলসি বাবদ ব্যাংকের পাওনা ২৪৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
ওরিয়ন কাদেরিয়া টেক্সটাইলের ঋণ ৪ কোটি টাকা। ওরিয়ন টি কোম্পানির ঋণ ৩৩ কোটি ৯ লাখ ১১ হাজার ৯৯ টাকা। এর মধ্যে ৯ কোটি ৪০ লাখ ২৩ হাজার ৯৪২ টাকা পরিশোধ হয়নি। নন-ফান্ডেড হিসেবে ব্যাংকের পাওনা ৫২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। স্টার অ্যাকসেসরিজের ঋণ ১৫ কোটি ৬৯ লাখ ৪৯ হাজার ৯৯৯ টাকা। এর মধ্যে ১৫ লাখ ৭ হাজার ৯৯৫ টাকা পরিশোধ হয়নি। নন-ফান্ডেড ২০ লাখ ৫২ হাজার ৪০৬ টাকা এবং এলসি বাবদ ৩ কোটি ১৬ লাখ ৫০ হাজার ৯১৯ টাকা পাওনা।
সূত্র: খবরের কাগজ
সবুজ পত্র সবুজের সমারোহে বাংলাদেশ