কবি – আব্দুল মান্নান তালিব

মারা গেলেন কবি আজিম-উশ শান। নামে যেমন আজিম-উশ-শান তেমনি নামও করেছিলেন কবি আজিম উশ-শান। দেদার গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, নাটক ও উপন্যাস লিখেছিলেন তিনি। অনেক হাসির কাহিনী লিখে তিনি মানুষকে প্রচুর আনন্দ দিয়েছিলেন। তাঁর ভক্তের সংখ্যা ছিল অগণিত। সারা দেশে কবি আজিম উশ-শানের নাম জানেনা এমন লোক হয়তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না। যুব কিশোররা তাঁর আশে পাশে সব সময় ভীড় করে থাকতো। ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ সবাই তাকে চিনতো। তাঁর লেখা সবাই পড়তো। তাঁর মৃত্যুতে সারাদেশে শোকের ছায়া নামলো। লাশ কাঁধে কবরস্তানের দিকে চললো কবির পরিবার পরিজন, ভক্ত-অনুরক্তের দল। সবারই মুখ মলিন বিষন্ন। মুখে কালেমা পড়ছে সবাই আর মনে মনে কবির জন্য মাগফেরাত কামনা করছে আল্লাহর দরবারে। দেশ জুড়ে শোক সভা হলো। অনেক শোক গাথা রচিত হলো। ভক্তজনেরা কবির প্রশংসায় গদগদ হলো। যুব-কিশোর সমাজ কবিকে নতুন পথের দিশারী রূপে বরণ করলো। কবির নির্দেশিত পথে তারা পুরাতন রীতি নীতি ও ঘুণে ধরা সমাজ প্রথার বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহ অভিযান চালিয়ে যাবে বলে ঘোষণা করলো। কবি মরে গিয়েও লাখো মানুষের মনে অমর হয়ে রইলেন। সেদিন কবির কবরের পাশে আর একটি কবর দেয়া হলো। শহরের এক মস্ত বড় গুন্ডাও মারা গিয়েছিল সেদিন। নামজাদা কবির কবরের পাশে রচিত হলো নামজাদা গুন্ডার কবর। কবরস্তান থেকে সবাই চলে আসার সাথেই আল্লাহর হুকুমে আজাবের ফেরেশতারা নেমে এলেন। উভয়ের গোর আজাব শুরু হলো। কবি আর গুন্ডা উভয়ের ওপর সমানে আজাব চলতে থাকলো। যতই দিন যেতে থাকলো ততই আজাব বাড়তে থাকলো, আজাবের রূপ ভয়াবহ হতে লাগলো। অবশেষে একদিন আজাবের ফেরেশতারা গুন্ডার আজাব বন্ধ করে দিল। কিন্তু কবির আজাব তখনো সমানে চলছিল। বরং দিনের পর দিন বেড়েই চলছিল। কবির ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল।

আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলো কবি আজিম-উশ-শান, “ও হে আল্লাহ! আমার প্রতিবেশী গুন্ডার আজাব বন্ধ হয়ে গেলো। সে কত বদ লোক। শহরে একশত লোক খুন করেছে। কত লোকের মালমাত্তা লুট করেছে, কত গরীবকে কাঁদিয়েছে। তার অত্যাচারে শহরের লোকেরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তার মৃত্যুতে লাখো লাখো মানুষ হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। মানবতার এত বড় দুশমন যে গুন্ডা তার আজাব বন্ধ হয়ে গেলো। আর আমার আজাব এখনো বন্ধ হলো না। আমি কত গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, উপন্যাস ও নাটক লিখেছি, কত লোককে আনন্দ দিয়েছি। আমার মৃত্যুতে নগরে শোকসভা হয়েছে। নওজোয়ানরা শোক মিছিল বের করেছে। আমার মৃত্যুতে মানবতার কতই না ক্ষতি হয়েছে। অথচ আমার এই আজাব এখনো বন্ধ হলো। না। আর ওই গুন্ডাটার আজাব বন্ধ হয়ে গেলো। হে আল্লাহ! তোমার এই ইনসাফ তো। আমি বুঝতে পারছি না। আমি কি ওই গুন্ডাটার চাইতেও খারাপ? ওর চাইতেও বেশী গুনাহগার?”

আল্লাহ বললেনঃ “হে আজিম-উশ-শান! আমি ইনসাফ করেছি। আমার জাহানে কনামাত্রও বে-ইনসাফী নেই। সে গুন্ডা। কিছু লোককে সে খুন করেছিল। কয়েকজনের টাকা-কড়ি লুঠ করেছিল। মাত্র কয়েকজনের। সে মারা গেছে। তার কাজও শেষ হয়ে গেছে। তার কাজগুলো খুবই খারাপ। তার যা শাস্তি পাবার সে পেয়ে গেছে। তার শাস্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তুমি? তুমি কবি। তুমি গল্প রচয়িতা। তুমি প্রবন্ধকার। তুমি নাট্যকার। তুমি লেখক। লেখার সাহায্যে তুমি মানুষকে পরিচালিত করেছে। আমি তোমাকে প্রতিভা দান করেছিলাম। কিন্তু তুমি তার সদ্ব্যবহার করোনি বরং তাকে অসৎ পথে ব্যয় করে মানুষের মহা ক্ষতি সাধন করেছে। কিয়ামত পর্যন্ত এ ক্ষতি পূরণের আর কোন সম্ভাবনা নেই। তুমি নিজের লেখার সাহায্যে মানুষকে সৎ পথে পরিচালিত না করে অসৎপথে চালিয়েছো। তোমার লেখা পাঠ করে যুব সমাজ উচ্ছংখল হয়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে ব্যভিচার, গুন্ডামী এমন কি কথায় কথায় নরহত্যার প্রবণতাও জাগছে। তারা সততা, ন্যায়-নীতি বিসর্জন দিয়েছে। ছোটদের প্রতি স্নেহ-মমতা ও বড়দের প্রতি সম্মানবোধ বিলুপ্ত হচ্ছে। এগুলোকে তারা সেকেলে রেওয়াজ বলে মনে করছে। শিক্ষকদের অসম্মান করতে পারলে তারা গর্ব অনুভব করে। আরো বহু অসৎ কাজ করে যাচ্ছে। তাদের এসব অসৎ কাজের অংশ তুমিও লাভ করছ।”

“তবু এরও তো একটা শেষ আছে, হে আল্লাহ?” কবির কণ্ঠ থেকে নিরাশা ঝরে পড়ছিল।

“না এর শেষ এখনো দেখা যাচ্ছে না, আল্লাহ বলে যেতে লাগলেন। “তুমি মরে গেছে। কিন্তু তোমার লেখা বেঁচে আছে। তোমার গল্পের বই আবার ছাপা হচ্ছে। তোমার কবিতার বই আবার ছাপা হবে। তোমার লেখা নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। তোমার লেখা বহু লোক পড়েছে। আরো বহু লোক পড়বে। বহুদিন ধরে পড়বে। দুনিয়ার কয়েকটি ভাষায় তোমার লেখার অনুবাদও চলছে। কাজেই তোমার লেখার সাহায্যে পাপগুলো দুনিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। তোমার লেখায় অনুপ্রাণিত হয়ে দুনিয়ার যেখানে যে অসৎ কাজটি হচ্ছে তার গোনাহর অংশ তোমার আমল নামায়ও লেখা হচ্ছে। আবার তোমার লেখার কথা একদিন মানুষ ভুলে গেলেও তোমারি সাহিত্যের আদর্শ গ্রহণ করে অনেক নতুন লেখক এগিয়ে আসবে। তাদের মাধ্যমে মানুষের অসৎ কাজ থেকে তুমি নিজের অংশ পেতে থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত। তাই তোমার শাস্তিও চলতে থাকবে।”

“তাহলে কি আমার কোন আশা নেই?” কবি কাঁদতে লাগলো।

“কোনো আশা নেই। তবে যদি তুমি লেখার সাহায্যে মানুষকে সৎপথে চালাতে তাহলে তার সুফলও এমনিভাবে পেতে। তুমি যদি ভালো ভালো কবিতা লিখতে। ভালো ভালো উপন্যাস নাটক রচনা করতে। তোমার কবিতা, উপন্যাস, নাটকে প্রভাবিত হয়ে যদি সমাজে সুকৃতির প্রচলন হতো এবং দুস্কৃতি নির্মূল হবার পথ তৈরি হতো তাহলে সুকৃতি প্রতিষ্ঠিত হতো এবং দুস্কৃতি খতম হয়ে যেতো। তোমার রচনায় প্রভাবিত হয়ে যে সব যুবক সমাজ পুনর্গঠনের কাজে লিপ্ত হতো তারা যে পরিমাণ নেকী অর্জন করতো সেই পরিমাণ নেকী তোমার ভাগেও লেখা হতে থাকতো। তাহলে তোমার মর্যাদা আরো বেড়ে যেতে থাকতো। এটা কিয়ামত পর্যন্ত বাড়তেই থাকতো। তোমার প্রতিভা ও ক্ষমতা ছিল অনেক বেশী। কিন্তু তুমি তার সদ্ব্যবহার করোনি। নফসের তাবেদারী করে নিজের খেয়াল খুশী মতো চলেছো। খেয়াল খুশী মতো লিখেছো। আমার অনুগত হয়ে তোমার কলম পরিচালনা করোনি। তুমি মানুষকে খুব বেশী গোমরাহ করেছো। তার সমস্ত ফল তোমাকে ভোগ করতে হবে। নিজের দোষেই তুমি আজাব ভোগ করছো।”

কবির ওপর শাস্তি চলতে থাকলো পুরোদমে।