ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের প্রাচীনতম, সর্ববৃহৎ এবং উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ১৯২০ সালে ভারতীয় বিধানসভায় গৃহীত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইনবলে ১৯২১ সালের ১ জুলাই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। ঢাকার রমনা এলাকার প্রায় ৬০০ একর জমি নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর প্রাথমিক অবকাঠামোর বড় একটি অংশ গড়ে উঠে ঢাকা কলেজের শিক্ষকমন্ডলী এবং কলেজ ভবনের (বর্তমান কার্জন হল) উপর ভিত্তি করে। ৩টি অনুষদ (কলা, বিজ্ঞান ও আইন), ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক, ৮৪৭ জন ছাত্র-ছাত্রী এবং ৩টি আবাসিক হল নিয়ে এ প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। কলা অনুষদের অধীনে ছিল ৮টি বিভাগ: সংস্কৃত ও বাংলা, ইংরেজি, শিক্ষা, ইতিহাস, আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ, ফার্সি ও উর্দু, দর্শন এবং রাজনৈতিক অর্থনীতি; বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে ছিল পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং গণিত; আইন অনুষদের অধীনে ছিল শুধুমাত্র আইন বিভাগ। ৩টি অনুষদের ৮৭৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৮৬ জন ঢাকা (শহীদুল্লাহ) হলে, ৩১৩ জন জগন্নাথ হলে এবং ১৭৮ জন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি হয়।

২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩টি অনুষদ, ৭০টি বিভাগ (৩টি প্রস্তাবিত), ৮টি ইনস্টিটিউট, ৩৯টি ব্যুরো ও গবেষণা কেন্দ্র, ১৭৫০ জন শিক্ষক, ৩৩,১০৩ জন ছাত্র-ছাত্রী, ১৯টি আবাসিক হল (২টি নির্মাণাধীন), ৩টি হোস্টেল ও ২৪৭টি ট্রাস্ট ফান্ড রয়েছে। বর্তমান শিক্ষকদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত; অনেকেই শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র বাংলাদেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মোহাম্মদ ইউনুস ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পূরস্কার লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকই বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল আছেন। প্রাথমিক বছরগুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকগণ কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে শিক্ষার উচ্চমান বজায় রাখতে সচেষ্ট ছিলেন, যার ফলশ্রুতিতে এ প্রতিষ্ঠান ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করে।

অনুষদ
নাম প্রতিষ্ঠাকাল বিভাগের সংখ্যা প্রথম ডীন
কলা অনুষদ ১৯২১ ১৬ ড. আর.সি মজুমদার
বিজ্ঞান অনুষদ ১৯২১ অধ্যাপক ডব্লিউ.এ জেঙ্কিন্স
আইন অনুষদ ১৯২১ ড. এন.সি সেনগুপ্ত
চিকিৎসা অনুষদ ১৯৪৬ অঙ্গীভুত মেডিকেল কলেজ মেজর ডব্লিউ জে. ভারজিন
শিক্ষা অনুষদ ১৯৫৬ অঙ্গীভুত কলেজ ও ইনস্টিটিউট মো. ওসমান গনি
স্নাতকোত্তর চিকিৎসা বিজ্ঞান ও গবেষণা ১৯৭২ অঙ্গীভুত মেডিকেল কলেজ অধ্যাপক ডা. এন. ইসলাম
বিজনেস স্টাডিজ ১৯৭০ অধ্যাপক আব্দুল্লাহ ফারুক
সামাজিক বিজ্ঞান ১৯৭০ ১১ অধ্যাপক মীর্জা নুরুল হুদা
জীব বিজ্ঞান অনুষদ ১৯৭৪ অধ্যাপক এ.কে.এম নূরুল ইসলাম
ফার্মেসি অনুষদ ১৯৯৫ অধ্যাপম ড. মুনীরউদ্দিন আহমেদ
চারুকলা অনুষদ ২০০৮ অধ্যাপক আব্দুস শাকুর শাহ্
ইঞ্জিনিয়রিং অ্যান্ড টেকনোলজি ২০০৮ অধ্যাপক নিমচন্দ্র ভৌমিক (ভারপ্রাপ্ত)
আর্থ অ্যান্ড এনভারয়নমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদ ২০০৮ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল হাসান (ভারপ্রাপ্ত)
ইনস্টিটিউট
নাম স্থাপিত ছাত্র/ছাত্রী সংখ্যা প্রথম পরিচালক
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৬১ ৮০০ ড. জি. ডি মরিসন
পরিসংখ্যান গবেষণা ও শিক্ষণ ইনস্টিটিউট ১৯৬৪ ৩৯৩ ড. কাজী মোতাহার হোসেন
ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট ১৯৬৬ ৮৩৮ অধ্যাপক এম. শফিউল্লাহ
পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ১৯৬৯ ২৩৮ অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমদ
সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৭৩ ৯৫৪ অধ্যাপক এম.এ মোমেন
আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট ১৯৭৪ ১০৭৬ অধ্যাপক এ.এইচ.এম আব্দুল হাই
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট ১৯৯৮ ১২০ ড. সুশীল রঞ্জণ হাওলাদার
তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট ২০০১ ১৪৬ অধ্যাপক আহমেদ শফি

অবহেলিত পূর্ববাংলার বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব সৃষ্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পূর্বপর্যন্ত এ বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়ার মধ্যে উচ্চশিক্ষার বিশিষ্ট আবাসিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য ছিল। দেশ বিভাগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ববাংলার মাধ্যমিক স্তরের ঊধ্বর্তন সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষা ও অধিভূক্তিকরণ (affiliating) প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এ গুরুদায়িত্বের ফলে পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটতে থাকে, যার ফলে এর জনবল ও সুযোগ-সুবিধার ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি হয়। এরপর আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর থেকে চাপ কমে নি। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে অভাবনীয়রূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন বেশ কিছু স্বনামধন্য শিক্ষক, ছাত্র ও কর্মচারীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। নিহত শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন ড. গোবিন্দচন্দ্র (জি.সি) দেব (দর্শন বিভাগ), ড. এ.এন.এম মনিরুজ্জামান (পরিসংখান বিভাগ), সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য (ইতিহাস বিভাগ), ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা (ইংরেজি বিভাগ), প্রফেসর এ.এন মুনীর চৌধুরী (বাংলা বিভাগ), মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (বাংলা বিভাগ), ড. আবুল খায়ের (ইতিহাস বিভাগ), ড. সিরাজুল হক খান (শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট), রাশীদুল হাসান (ইংরেজি বিভাগ), আনোয়ার পাশা (বাংলা বিভাগ), ড. ফজলুর রহমান (মৃত্তিকা বিভাগ), গিয়াসউদ্দিন আহমদ (ইতিহাস বিভাগ), ড. ফয়জুল মহি (শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট), আব্দুল মুকতাদির (ভূ-তত্ত্ব বিভাগ), শরাফৎ আলী (গণিত বিভাগ), সাদত আলী (শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট), আতাউর রহমান খান খাদিম (গণিত বিভাগ) এবং অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য (পদার্থবিদ্যা বিভাগ)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান মেডিক্যাল অফিসার ডা. মোহাম্মদ মর্তুজা এবং ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের শিক্ষক মোহাম্মদ সাদেকও নির্মমভাবে নিহত হন।

আবাসিক হল/হোস্টেল
হলের নাম স্থাপিত আবাসিক ছাত্র/ছাত্রী সংখ্যা প্রথম প্রাধ্যক্ষ
সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ১৯২১ ৮০৫ স্যার এ.এফ রহমান
শহীদুল্লাহ হল (ঢাকা হল) ১৯২১ ১২২৫ প্রফেসর এফ.সি টার্নার
জগন্নাথ হল ১৯২১ ১৮০২ ড. নরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত
ফজলুল হক (মুসলিম) হল ১৯৪০ ৭৬৬ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ
জহুরুল হক (ইকবাল) হল ১৯৫৭ ১৩২৫ ড. মফিজ উদ্দিন আহমেদ
রোকেয়া হল ১৯৬৩ ১৯০৪ মিসেস আখতার ইমাম
সূর্যসেন (মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ) হল ১৯৬৬ ১০৪৭ প্রফেসর এম শফিউল্লাহ
পি.জে হার্টগ (আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাস) ইন্টারন্যাশনাল হল ১৯৬৬ ১২৪ মোঃ আফসার উদ্দিন
হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ১৯৬৭ ১১৯২ প্রফেসর মোঃ ইন্নাস আলী
শামসুন নাহার হল ১৯৭১ ১৩৫০ ড. সৈয়দা ফাতেমা সাদেক
কবি জসীম উদদীন হল ১৯৭৬ ৩৮৭ অধ্যাপক কে.এম.এ কামরুদ্দিন
স্যার এ.এফ রহমান হল ১৯৭৬ ১০০০ ড. এ.এম.এম নূরুল হক ভুইঁয়া
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ১৯৮৮ ৭৩০ প্রফেসর আবু জাফর
মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ১৯৮৮ ৯৪৪ ড. আ.ফ.ম খোদাদাদ খান
বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হল ১৯৮৯ ৭০০ ড. হামিদা আখতার বেগম
অমর একুশে হল ২০০০ ৫৯৬ ড. সহিদ আকতার হুসাইন
বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল ২০০০ ৬৪৯ ড. নাসরীন আহমাদ

নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ছাত্র-শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিগত নয় দশকে এর গৌরবময় ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে। আজ যাঁরা দেশের শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রশাসন, কূটনীতি, জনসংযোগ, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প কারখানায় নিয়োজিত রয়েছেন, তাঁদের প্রায় ৭০% এসেছেন এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষালাভ করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় নি। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ভারত সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হলে বঙ্গভঙ্গ রদের রাজকীয় ক্ষতিপূরণ হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হন স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ। তিনি এর আগে ১৭ বছর লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা রেজিস্ট্রার হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সদস্য ছিলেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে মুসলিম সংখ্যাগুরু পূর্ববাংলা ও  আসাম প্রদেশের জনগণের মনে এক নতুন আশা ও উদ্দীপনার সঞ্চার হয়।

কিন্তু মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রবল বিরোধিতার মুখে এ বিভক্তি রদ করা হলে মুসলমান সমাজ একে তাদের অগ্রযাত্রায় একটি বড় ধরনের আঘাত বলে মনে করে। প্রতীচ্য শিক্ষায় পঞ্চাশ বছর পশ্চাদ্বর্তী মুসলমানগণ বুঝতে পারে যে, শিক্ষাক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ হওয়াটাই সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে তাদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। ব্রিটিশ কর্তৃক প্রবর্তিত শিক্ষা কার্যক্রম সাদরে গ্রহণের মাধ্যমে হিন্দু সম্প্রদায় সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়। পক্ষান্তরে, মুসলিম সম্প্রদায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পেছনে পড়ে থাকে। এ মনোভাব সম্পর্কে অন্তত চারটি কমিশন মন্তব্য করে, যার মধ্যে ছিল ১৮৮২ সালের  হান্টার কমিশন, ১৯১২ সালের নাথান কমিটি, ১৯১৩ সালের হর্নেল কমিটি এবং ১৯১৭ সালের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন।

ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ বাংলা বিভক্তি বাতিলের সিদ্ধান্তে মুসলিম সম্প্রদায়ের অসন্তোষের বিষয় উপলব্ধি করে তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকা ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। তখন মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকজন বিশিষ্ট নেতা ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ, নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এবং এ.কে ফজলুল হক। সাক্ষাৎকালে তাঁরা বঙ্গভঙ্গ রহিত করায় শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। বঙ্গবিভক্তি বিলোপের ক্ষতিপূরণ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে তারা ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানান। লর্ড হার্ডিঞ্জ এ প্রস্তাবের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং বিষয়টি তিনি ব্রিটিশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর নিকট সুপারিশ করবেন বলেও অঙ্গীকার করেন। ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক সরকারি ঘোষণায় এ বিষয়টি স্বীকৃত হয়। লর্ড হার্ডিঞ্জ স্বীকার করেন যে, ১৯০৬ সাল থেকে পূর্ববাংলা ও আসাম উন্নতির পথে অনেকটা এগিয়ে গেছে। তিনি জানান যে, ওই বছর পূর্ববাংলা ও আসামে ১,৬৯৮ জন উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র-ছাত্রী ছিল এবং ওই খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১,৫৪,৩৫৮ টাকা। অবস্থার উন্নতির ফলে ওই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২,৫৬০ ছাত্রছাত্রীতে এবং অর্থব্যয় হয়েছে ৩,৮৩,৬১৯ টাকা। ১৯০৫ থেকে ১৯১০-১১ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা ৬,৯৯,০৫১ হতে ৯,৩৬,৬৫৩-তে উন্নীত হয় এবং প্রাদেশিক কোষাগার থেকে এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ১১,০৬,৫১০ টাকা থেকে ২২,০৫,৩৩৯ টাকায় বৃদ্ধি করা হয়। একইভাবে স্থানীয় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খরচ ৪৭,৮১,৮৩৩ টাকা থেকে বেড়ে ৭৩,০৫,২৬০ টাকায় দাঁড়ায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারি সিদ্ধান্তে হিন্দু নেতৃবৃন্দ ক্ষুব্ধ হন। কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ভাইসরয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ঢাকায় একটি পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বস্ত্তত হবে বাংলাকে ‘অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্তির’ শামিল। তাঁরা আরও মত প্রকাশ করেন যে, পূর্ববাংলার মুসলিম সম্প্রদায় বেশির ভাগই কৃষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাদের কোনো উপকার হবে না। লর্ড হার্ডিঞ্জ প্রতিনিধিদলকে আশ্বস্ত করেন যে, বাংলাকে পুনরায় বিভক্ত করার কোনো পদক্ষেপ সরকার কর্তৃক গৃহীত হবে না। তিনি আরও বলেন যে, এ নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হবে আবাসিক এবং তা সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

এক পর্যায়ে লর্ড হার্ডিঞ্জ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জীকে জানিয়ে দেন যে, তাঁদের বিরোধিতা সত্ত্বেও ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। উপরিউক্ত প্রতিরোধ ছাড়াও এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আরও কিছু আইনগত ও বস্ত্তগত জটিলতা ছিল।

লন্ডনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাভের পর ভারত সরকার ১৯২১ সালের ৪ এপ্রিল এক পত্রের মাধ্যমে বাংলা সরকারকে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত বিশদ পরিকল্পনা এবং এর আর্থিক সংশ্লেষ সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। এতদুদ্দেশ্যে ২৭ মে লন্ডনের ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানকে প্রধান করে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি নিয়োগ করা হয়। এ কমিটির সদস্য ছিলেন বাংলার গণশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক জি.ডব্লিউ কুচলার, কলকাতা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট ড. রাসবিহারী ঘোষ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, নবাব সিরাজুল ইসলাম, ঢাকার জমিদার ও উকিল আনন্দচন্দ্র রায়, ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ ডব্লিউ.এ.টি আর্চবোল্ড, জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ ললিতমোহন চট্টোপাধ্যায়,  ঢাকা মাদ্রাসার (পরবর্তীকালে ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ, বর্তমান  কবি নজরুল সরকারি কলেজ) সুপারিন্টেন্ডেন্ট শামসুল উলামা আবু নসর মুহম্মদ ওয়াহেদ, আলীগড়ের মোহাম্মদ আলী, কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যক্ষ এইচ.আর জেমস, প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক সি.ডব্লিউ পিক এবং কলকাতা সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ সতীশচন্দ্র আচার্য। নাথান কমিটি নামে পরিচিত এ কমিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি প্রকল্প প্রণয়ন করেন। প্রস্তাবে বলা হয় যে, এ বিশ্ববিদ্যালয় হবে শিক্ষাদান ও আবাসিক কার্যক্রম সম্বলিত প্রতিষ্ঠান এবং কেবল শহরের কলেজগুলি এর আওতাধীন থাকবে। কমিটি অতি দ্রুত ২৫টি বিশেষ উপকমিটির পরামর্শ গ্রহণ করে এবং ওই বছর শরৎকালের মধ্যেই তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। প্রতিবেদনে প্রস্তাবিত অবকাঠামোর ইমারতের নকশাসহ ৫৩ লাখ টাকা (পরবর্তীকালে গণপূর্ত বিভাগ কর্তৃক ৬৭ লাখ ঢাকায় উন্নীত) মূল ব্যয় এবং ১২ লাখ টাকা বাৎসরিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্তকাজ ও পাঠদানবিষয়ক তথ্যাদি বিশদ আকারে বর্ণিত হয়। কমিটির মতে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার, লিডস, লিভারপুল প্রভৃতি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় এ প্রতিষ্ঠানটি হবে একক আবাসিক শিক্ষাক্ষেত্র।  ঢাকা কলেজ,  জগন্নাথ কলেজ, মোহামেডান কলেজ, উইমেন্স কলেজসহ সাতটি কলেজ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় থাকবে। কলা ও বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর শিক্ষাসহ আইন, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও অন্যান্য বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের আওতাভুক্ত থাকবে। পরবর্তীকালে এলাহাবাদ, বেনারস, হায়দ্রাবাদ, আলীগড়, লক্ষ্ণৌ এবং আন্নামালাইতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল অনুসরণ করা হয়।