বাংলায় একটা প্রবাদ আছে – ‘তুমি কোন হরিদাস পাল?’ অর্থ: তুমি আসলে কে, তোমার দাম কতটুকু? কিন্তু আজকের এই হরিদাস সেই প্রবাদকে অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। কারণ এই লোকের একটা পরিচয় নয়, দুটো। একটা মঞ্চ নয়, দুটো। এবং দুটো মঞ্চের পেছনে, অবাক করার মতো, একটাই হাত।

২০২২ সালের ৭ নভেম্বর রাতে বনানী থেকে র্যাব-৩ ও এনএসআই যাকে গ্রেফতার করে, তার পরিচয়পত্রে নাম লেখা ‘তাওহীদ ইসলাম’। আসল নাম: হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস। বগুড়ার শিবগঞ্জের সন্তান, পড়াশোনা ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত।
.
ষষ্ঠ শ্রেণির পর সে পাড়ি দেয় ভারতে। সেখানে পঞ্চায়েত প্রধানের কাছ থেকে ‘এতিম সার্টিফিকেট’ জোগাড় করে উচ্চমাধ্যমিক পাস এবং ইলেকট্রনিক বিষয়ে দুই বছরের প্রশিক্ষণ। দেশে ফেরে এসি মেকানিক হিসেবে। ২০১৮ সালে সে উত্তরায় একজন সবজি বিক্রেতার সাথে সাবলেট বাসায় থাকত। মাত্র এক বছরের ভেতর সে ধর্ম পরিবর্তন করে, নাম নেয় তাওহীদ ইসলাম এবং শুরু হয় তার আসল কর্মকাণ্ড!
প্রধানমন্ত্রী পরিবারের সাথে এডিট করা ভুয়া ছবি, তাদের নামে জাল নম্বর সেভ করে কল এবং নকল ডিও লেটার – এই তিনটি দিয়ে শতাধিক মানুষের কাছ থেকে চাকরি-বদলি-টেন্ডারের নামে আত্মসাৎ করে নেয় প্রায় ৫ কোটি টাকা। স্বর্ণ চোরাচালানেও তার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। জালিয়াতির সেই টাকাতেই ২০১৯ সালে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় দাঁড়িয়ে যায় ৩ কোটি টাকার ‘প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট রিসোর্ট’।
.
একজন সাধারণ মেকানিক ভারতে গিয়ে ‘বিশেষ প্রশিক্ষণ’ নিল, দেশে ফিরে ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলিম মেয়ে বিয়ে করে নিল, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাকেন্দ্রের নাম ভাঙিয়ে কোটি টাকা লুটটে শুরু করল, এই সমস্ত পরিকল্পনা কি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল, নাকি অন্য কারও প্ররোচনায় ঘটেছে, পেছন থেকে অন্য কারও হাত ছিল?
গ্রেফতারের পর হরিদাস আবার ফিরে আসে। এবার নতুন মঞ্চ: গাইবান্ধার পলাশবাড়ী। নতুন পরিচয়: ‘হরিদাস বাবু’, মন্দির কমিটির সভাপতি। রামচন্দ্রপুর গ্রামে দেবোত্তর সম্পত্তির ৭৬ শতাংশ জমিতে গড়ে উঠেছে শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির কমপ্লেক্স। ২৮ ফুট উচ্চতার, তিন টন ওজনের শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ – বলা হচ্ছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। পরিকল্পনায় ১৪৪টি দেব-দেবীর প্রতিমা। মোট ব্যয়ের দাবি সূত্রভেদে ২২ কোটি থেকে ৪০ কোটি টাকার মধ্যে।
এই টাকা কোথা থেকে এলো? এখানেই গল্পটা আলাদা মোড় নেয়।
.
ইউটিউব সাক্ষাৎকারে হরিদাস বাবু নিজেই বলেছে: ‘এই প্রতিষ্ঠানের সকল ব্যয় আমার, একটি টাকাও কেউ দেয়নি।’ কিন্তু Somoy TV’র রিপোর্টে ঠিক সেই একই মানুষ বলছে ভিন্ন কথা, এসব নাকি ভক্ত ও অনুরাগীদের দান! একটি বিবৃতি সত্য হলে আরেকটি মিথ্যা – এই দুটো একসাথে সত্য হওয়ার কোনো উপায় নেই। আওয়ামী আমলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খাবার বিতরণ করে ১০০ কোটি টাকা আয়ের দাবিও তার নিজের মুখের। সেই হিসাবের কোনো অডিট নেই, কোনো প্রশ্নও করা হয়নি।
স্থানীয় শিক্ষক নাইম ইসলাম সরাসরি বলেছেন, এই টাকা আসছে ভারত থেকে, গোপনে। গাইবান্ধা ইমাম উলামা পরিষদ ও হেফাজতে ইসলাম জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে ৮ দফা স্মারকলিপি দিয়ে অর্থের উৎস তদন্তের দাবি জানিয়েছে। চাপের মুখে মন্দির কমিটি রামমূর্তি নির্মাণ সাময়িক স্থগিতও করেছে।
.
এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বিরক্তিকর প্রশ্নটি উঠেছে মিডিয়ার ভূমিকাকে কেন্দ্র করে। ২০২২ সালে র্যাবের গ্রেফতার ও প্রতারণার সংবাদ বহু মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে। তথ্যটা মিডিয়ার কাছে নতুন নয়।
কিন্তু ২০২৫ সালে অর্থাৎ গ্রেফতার পরবর্তী সময়ে একই ব্যক্তিকে নিয়ে কী ধরনের সংবাদ হলো দেখুন:
Somoy TV – ‘হরিদাস বাবু যেন রূপান্তরের জাদুকর!’ – এই শিরোনামে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট। প্রতারণার ইতিহাস উল্লেখ নেই। টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন নেই। পুরোটাই ইতিবাচক আলোয় উপস্থাপন।
Morning Post BD (সেপ্টেম্বর ২০২৫)- ‘গাইবান্ধায় তীর্থস্থানের নতুন ঠিকানা’ – শিরোনামে গুণগ্রাহী রিপোর্ট। হরিদাস বাবুর স্বপ্নের বর্ণনা, মন্দিরের মহিমা, দর্শনার্থীর সংখ্যা। কোনো সমালোচনা নেই, কোনো প্রশ্ন নেই।
Dainik Alokito News (জুন ২০২৫) – ‘গ্রামের কৃতি সন্তান, সমাজসেবক হরিদাস বাবু’ – এই বিশেষণে রিপোর্ট। মন্দিরের বিস্তারের পরিকল্পনার সুরেলা বর্ণনা।
একজন প্রতারক, যার গ্রেফতারের খবর এই মিডিয়াগুলোর কাছে রয়েছে তাকে কোন স্বার্থে ‘রূপান্তরের জাদুকর’ বলা হচ্ছে? বিজ্ঞাপনের টাকা, নাকি অন্য কোনো চাপ?
সাংবাদিকতার মূলনীতি হলো তথ্য যাচাই করা। কিন্তু এই রিপোর্টগুলোতে সেই যাচাই নেই। প্রশ্ন হলো – এটা অজ্ঞতা, নাকি উদ্দেশ্যমূলক?
একই সাথে সে সমস্ত কথিত সুশীল শ্রেনীও মুখে তালা দিয়ে বসে আছে যারা তাদের জীবনে একবার আস সুন্নাহ’র অডিট নিয়ে একটি পোস্ট করতে পারলে নিজের জীবন ধন্য মনে করে! তাদের কোথাও দেখতে পাচ্ছেন? পাবেন না।
.
২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর। রাজশাহীর ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার মনোজ কুমার সশরীরে উপস্থিত হন পলাশবাড়ীর এই মন্দিরে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন বিগ্রহটি। কূটনৈতিক প্রোটোকলে একজন বিদেশি সহকারী হাই কমিশনার প্রত্যন্ত গ্রামের বেসরকারি মন্দির উদ্বোধনে যান না – বিশেষত যার প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা রয়েছে। তবু গেলেন। এটা কি ব্যক্তিগত আগ্রহ, নাকি দিল্লির নির্দেশ?
এই একটি উপস্থিতি পুরো ছবিটা বদলে দেয়।
.
এই বির্তকের মাঝেই গত ১৭ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কার্যের সামনে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ হিন্দু নেতা পলাশ কান্তি দে প্রকাশ্য বক্তব্যে রামমন্দির নির্মাণে কঠোর হুশিয়ারী প্রদান করে, যা শুনে মনে হবে না সে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম রাষ্ট্রে না বরং হিন্দু অধ্যুষিত ভারতে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছে – “তোরা যদি রাম মন্দিরকে ভয় পাস, তোরা প্রয়োজনে পলাশবাড়িতে যাস না। তোরা প্রয়োজনে গাইবান্ধা থেকে অন্য জেলায় চলে যা। রাম মন্দির পলাশ বাড়িতেই হবে… বাংলাদেশে এমন কোনো শক্তি নাই যে রামমন্দির প্রতিষ্ঠা ঠেকায়।”
সে আরও দাবি করে, মন্দির কমিটিকে ‘প্রয়োজনে ঢাকা অচল করে দিয়ে’ রক্ষা করার আশ্বাস দিয়েছে এবং অভিযোগ করে – তত্ত্বাবধায়ক সরকার সাম্প্রদায়িক শক্তিকে মুক্ত করেছে।
একজন বিতর্কিত প্রতারকের গড়া মন্দিরের পক্ষে এমন প্রকাশ্য রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি প্রশ্ন তোলে – এই প্রকল্পকে রক্ষা করতে কারা এত সরব, এবং কেন?
.
Somoy TV হরিদাস বাবুকে ডেকেছে ‘রূপান্তরের জাদুকর’, Morning Post BD লিখেছে ‘তীর্থস্থানের নতুন ঠিকানা’। একটি রিপোর্টেও তার গ্রেফতারের ইতিহাস নেই, অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন নেই। এই মিডিয়াগুলোর কাছে সেই তথ্য ছিল, তবু নেই। That’s not journalism. That’s a press release with a byline.
Meaningless dots create a line. Meaningless lines create a pattern. Unattended patterns become strategy.
.
হরিদাস চন্দ্র তরনীদাস একজন প্রতারক – এটা প্রমাণিত। কিন্তু প্রশ্নটা শুধু তাকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটা হলো – ভারতে ‘প্রশিক্ষণ’, রাষ্ট্রের নাম ভাঙিয়ে অর্থ সংগ্রহ, কারামুক্তির পর বৃহৎ ধর্মীয় স্থাপনা, ভারতীয় কূটনীতিকের উপস্থিতি, অনুগত মিডিয়া – এই পুরো কাঠামো কি একজন ষষ্ঠ শ্রেণি পাস মেকানিকের একার পরিকল্পনা? নাকি এর চেয়েও বড় কিছু?
সবুজ পত্র সবুজের সমারোহে বাংলাদেশ