অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার এবং অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জনের পৃথক তিন মামলায় ৪৮ বছরের কারাদণ্ড কাঁধে নিয়েও বহাল তবিয়তে আছেন ওবায়দুল করিম। মামলার নথি গায়েব ও শুনানি পেছানোর কূটকৌশলে পার করেছেন ১৬ বছর। সাজা ঘোষণার তিনটিসহ তার বিরুদ্ধে মোট ১৪টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের ৪৮৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১১টি মামলা হয়। ২০০৭ সালে করা এসব মামলার বিচারকাজে এখন স্থবিরতা বিরাজ করছে। তবে এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগে ব্যাপক সমালোচিত ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিম ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে শীর্ষ দুর্নীতিবাজের তালিকার দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন। সে সময় যৌথ বাহিনীর গঠিত দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্সের অভিযানের সময় গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। তবে দুর্নীতির মামলা ও সাজা থেকে রক্ষা পাননি। তার অনুপস্থিতিতে বিশেষ আদালতে রায় ঘোষণা হয়। একটিতে যাবজ্জীবনসহ তিনটি মামলায় তার অন্তত ৪৮ বছর কারাদণ্ড হয়। এর মধ্যে ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের প্রায় ৭ কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে যাবজ্জীবন (৩০ বছর) কারাদণ্ড দেওয়া হয় ও আত্মসাতের সমপরিমাণ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার টাকা অনাদায়ে আরও দুই বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করা হয়। ২ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং পাচারের সমপরিমাণ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে আরও দুই বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করা হয়। অবৈধ উপায়ে ৫০ কোটি টাকার সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের দায়ে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জরিমানা করা হয় ১০ লাখ টাকা। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করা হয়।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মামলায় নথি গায়েবের ঘটনা: ওবায়দুল করিমের বিরুদ্ধে ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মতিঝিল থানায় মামলা করে দুদক। এ মামলার বিচারকাজ শেষে একই বছরের ২৭ ডিসেম্বর এক রায়ে ওবায়দুল করিমের যাবজ্জীবন (৩০ বছর) কারাদণ্ড ও আত্মসাতের সমপরিমাণ টাকা জরিমানা করেন বিশেষ জজ আদালত। এ রায় বাতিল চেয়ে ২০০৮ সালে হাইকোর্টে আবেদন করেন ওবায়দুল করিম। শুনানি শেষে একই বছর সাজার রায় স্থগিত করেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে দুদক আপিল করলে ২০০৯ সালে হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে ওবায়দুল করিমকে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। এরপর হাইকোর্টের আদেশসহ নথিপত্র নিম্ন আদালতে পৌঁছাতে সময় যায় প্রায় এক বছর। ২০১০ সালের ৯ ডিসেম্বর নথিপত্র পৌঁছায় বিচারিক আদালতে। এরপর দীর্ঘ ১২ বছর নথি গায়েব অবস্থায় থাকে। ২০২২ সালের ২০ এপ্রিল নথি গায়েবের বিষয়টি জানাজানি হলে সংশ্লিষ্ট ৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। অবশেষে নথি পাওয়া গেলেও মামলার স্থবিরতা কাটেনি।
দুদকের প্রসিকিউশন শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থবির থাকা সব মামলা সচল করার উদ্যোগ নিয়েছে কমিশন। প্রয়োজনে দুদকের নিয়োগ করা আইনজীবী পরিবর্তন করা হবে।
অবৈধ সম্পদের মামলায় ১৩ বছর কারাদণ্ড: অবৈধ উপায়ে ৫২ কোটি ৯২ লাখ টাকা অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে ২০০৭ সালের ৮ অক্টোবর রমনা থানায় মামলাটি করেন দুদকের উপপরিচালক আবদুল করিম। বিচার শেষে ২০০৮ সালের ২৫ জুন এক রায়ে অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে ১০ বছর এবং তথ্য গোপনের দায়ে ৩ বছরসহ মোট ১৩ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেন বিশেষ জজ আদালত-৯-এর বিচারক খন্দকার কামাল উজ-জামান। রায়ে ৫২ কোটি ৯০ লাখ টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত ঘোষণ করা হয়। এ ছাড়া ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করা হয়। রায়ে বলা হয়, ওবায়দুল পলাতক থাকায় তিনি যেদিন আত্মসমর্পণ করবেন বা গ্রেপ্তার হবেন, সেদিন থেকে সাজার মেয়াদ শুরু হবে। কিন্তু ওবায়দুল করিম রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করেন। হাইকোর্ট শুনানি শেষে রায় স্থগিত করেন। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে দুদক আপিল করলে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে ওবায়দুল করিমকে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। এ মামলায় বিচারিক আদালতে মামলার নথি খুঁজে না পাওয়ায় বিচারকাজে স্থবিরতা বিরাজ করছে।
অর্থ পাচারের মামলায় ৫ বছর কারাদণ্ড: সাতটি চেকের মাধ্যমে বিদেশে ২ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে ২০০৭ সালের ১০ অক্টোবর গুলশান থানায় মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন। এ মামলার বিচারকাজ শেষে ২০০৮ সালের ১৩ আগস্ট বিশেষ আদালতের রায়ে ৫ বছরের কারাদণ্ড হয়। এ ছাড়া ২ কোটি টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করা হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করেন ওবায়দুল করিম। একইভাবে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে তার আবেদন খারিজ হয়। আজও এ রায় বাস্তবায়ন হয়নি।
অর্থ আত্মসাতের আরও ১১ মামলা: জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের প্রায় ৪৮৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ওই ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিমের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ১১টি মামলা হয়। ওই ব্যাংকের তৎকালীন সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগের প্রধান মানজুর হোসেন তেজগাঁও থানায় মামলাগুলো করেন। এসব মামলায় অভিযোগ করা হয়, ওবায়দুল করিম ওই ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া হিসাব খুলে বংশাল, নবাবপুর, মিরপুর, কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর কয়েকটি শাখা থেকে ৪৮৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা উঠিয়ে নিয়ে আত্মসাৎ করেন। এ মামলাগুলোর বিচারেও স্থবিরতা বিরাজ করছে।
ওবায়দুল করিমের বিতর্কিত উত্থান: ব্যবসায়িক জগতে ওবায়দুল করিমের আবির্ভাব ঘটে ১৯৯৩ সালে নিলাম হওয়া কোহিনূর কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কেনার মধ্য দিয়ে। ১৯৯৪ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ওরিয়ন ইনফিউশন লিমিটেড। ১৯৯৬ সালে যখন দেশের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় হয়, তখন ওরিয়ন তার শেয়ারহোল্ডারদের জন্য বড় লভ্যাংশ এবং বোনাস শেয়ার ঘোষণা করে। এতে ওরিয়নের শেয়ারের দাম বহুগুণ বেড়ে যায়। তবে শেয়ারবাজার বিপর্যয়ের পর ওরিয়ন কোনো লভ্যাংশ বা বোনাস শেয়ার দেয়নি। এতে ওরিয়নের বিরুদ্ধে মামলা করে সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন। কিন্তু পরে মামলাটি অনিষ্পন্ন অবস্থায় অকার্যকর হয়ে যায়। সে সময়ে শেয়ারবাজারের কারসাজির জন্য অনুসন্ধান চালায় দুদক। কিন্তু সে অনুসন্ধানের কোনো প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি।
অবশ্য ২০০৭ সালে দুদকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে কিছু বড় বড় প্রকল্পের কাজ পান ওবায়দুল করিম। একই সঙ্গে টেন্ডারে কারচুপি ও অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। ওবায়দুল করিমের দুর্নীতি নিয়ে ২০০১ সাল থেকেই দেশে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তবে বিভিন্ন প্রভাব বিস্তারের কারণে মামলা হয়নি। ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের পর তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হতে থাকে। কিন্তু তিনি সব সময় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে অসাধু ব্যক্তিদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক রেখে এবং অব্যাহত প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে পার পেয়ে যাচ্ছেন।
সূত্র: খবরের কাগজ
সবুজ পত্র সবুজের সমারোহে বাংলাদেশ