ওবায়দুল করিমের অপকর্ম: বেলহাসা কোম্পানি হাইজ্যাক

সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক (ইউএই) বেলহাসা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানির ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেও বহাল তবিয়তে আছেন ওরিয়ন গ্রুপের মালিক ওবায়দুল করিম। প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে যৌথ মালিকানার কোম্পানি হাইজ্যাক করা হয়। এ নিয়ে মামলাও করে বেলহাসা। মামলায় জালিয়াতি, প্রতারণা ও নথি গায়েবের মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া হাইজ্যাক করা কোম্পানির নামে ১৬৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ওবায়দুল করিম।

জানা গেছে, ২০০৩ সালে যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে ঢাকা সিটি করপোরেশন। সে সময় আন্তর্জাতিক প্রকল্পে অংশগ্রহণের কোনো যোগ্যতা ওরিয়ন গ্রুপের না থাকায় আন্তর্জাতিক যোগ্যতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান বেলহাসা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দরপত্রে অংশ নেয় গ্রুপটি। আইনগত শর্ত পূরণের জন্য ওরিয়ন গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান একম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েশন লিমিটেডের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় কোম্পানি গঠন করা হয়। যৌথ মালিকানার কোম্পানির নাম দেওয়া হয় বেলহাসা একম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড।

নতুন এই কোম্পানির নামে ২০০৩ সালের আগস্টে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কার্যাদেশের ভিত্তিতে বেলহাসা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে। কিন্তু কিছুদিন পর গোপনে ওরিয়ন গ্রুপের মালিক তার ছেলেকে পরিচালক বানিয়ে বেলহাসার পরিচালকের সই জালিয়াতি করে বেলহাসা-একম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড নামেই কোম্পানি পর্ষদ পুনর্গঠন দেখান। কোনো রকম টিআইএন নম্বর ছাড়াই জালিয়াতির মাধ্যমে জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে নিবন্ধনও হাসিল করেন। এরপর যৌথ এ কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কর্তৃত্ব নিয়ে নেন ওবায়দুল করিম। এই সময়ের মধ্যে বেলহাসা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানির ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এর পর থেকে বিদেশি কোম্পানিটির সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করেন ওবায়দুল করিম।

একপর্যায়ে বিষয়টি জানার পর ওবায়দুল করিম ও তার ছেলে সালমান ওবায়দুল করিমসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ এনে ঢাকার একটি আদালতে মামলা করেন বেলহাসা ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির পাওয়ার অব অ্যাটর্নি হিসেবে প্রতিনিধিত্বকারী জুবায়ের আহমেদ ভূঁইয়া। এতে কোম্পানির নাম জালিয়াতি করার অভিযোগও আনা হয়। ২০০৫ সালে ঢাকার জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে জালিয়াতির মাধ্যমে সৃষ্ট ফার্মগুলোর সঙ্গে নিবন্ধিত বেলহাসা একমের মেমোরেন্ডাম এবং সংশ্লিষ্ট আর্টিকেলগুলো বাতিলের আদেশ চাওয়া হয়। মামলার শুনানি নিয়ে ২০১০ সালের ২৭ জুলাই এক আদেশে জুবায়েরকে কোর্ট ফি বাবদ ৪০ হাজার ২০০ টাকা জমা দিতে বলেন বিচারক মোহাম্মদ আস শামস জগলুল হোসেন। কয়েক বছর মামলার শুনানি হলেও পরে এ মামলার নথি খুঁজে না পাওয়ায় মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে বলে জানা গেছে।

মামলার আরজিতে বলা হয়, সরকার ২০০৩ সালের ৫ এপ্রিল যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্তের পর ঢাকা সিটি করপোরেশন ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। পরে ইউএই-ভিত্তিক বেলহাসা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি এবং ওবায়দুল করিমের বাংলাদেশ-ভিত্তিক একম ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড যৌথভাবে দর জমা দিয়ে কার্যাদেশ পায়। কার্যাদেশ পাওয়ার পর দুই কোম্পানি যৌথভাবে ফ্লাইওভার নির্মাণের চুক্তি করে। সে অনুসারে ওবায়দুল করিমের কোম্পানি বেলহাসা একম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড নামে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও ফার্মের কাছ থেকে একটি নিবন্ধন সনদের জন্য কোম্পানির আর্টিকেল অব মেমোরেন্ডাম জমা দেয়। কিন্তু জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজপত্র তৈরি করে ওবায়দুল করিম, সালমান ওবায়দুল করিম ও মেহেদী হাসান নিজেদের বেলহাসা একমের শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালক ঘোষণা করেন। তারা বেলহাসার ম্যানেজিং ডিরেক্টর মাজেদ আহমেদ ও একাধিক পরিচালকের সই জাল করে জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও ফার্মে নিবন্ধনের জন্য কাগজপত্র জমা দেন।

ওবায়দুল করিম, সালমান করিম ও মেহেদী হাসান শুধু সই জালিয়াতিই করেননি, তারা জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তির শর্তাবলি এবং জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও ফার্ম থেকে তাদের নিবন্ধনের আইন ও বিধিবিধান লঙ্ঘন করেছেন। আসামিরা বেলহাসার ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বেলহাসা একমের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

এদিকে মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম ও তারা ছেলে সালমান ওবায়দুল করিম হাইজ্যাক করা বেলহাসা একম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের নামে একটি ব্যাংক থেকে ১৬৬ কোটি ৩০ লাখ ২১ হাজার ৫০৮ টাকা ঋণ নিয়েছেন। এ কোম্পানির টিআইএন নম্বরও পাওয়া যায়নি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণখেলাপির তালিকায় ওবায়দুল করিমের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সূত্র: খবরের কাগজ