দরজা খুলে দেখলেন তুলোর মতো মেঘ ঘিরে ধরেছে আপনাকে! ঘরদোরতো বটেই সামনের উঠোন কিংবা দূরের পাহাড় সব যেন শুভ্র মেঘের দখলে। পাহাড় চূড়ার সকালটা এমনই।

একটু বেলা বাড়লে সূর্য যখন উঁকি দিতে সাহস করে তখন মেঘেদের পালিয়ে যাওয়া আর তার সমান্তরালে আলোর বিচ্ছুরণ যেন ঐশ্বরিক আলোর কারুকাজ। দূর পাহাড়ের চূড়া, গাছের ফাঁক গলে আলোর ছুটে চলা আর পাতায় পাতায় তার হাসি! যারপরনাই নান্দনিক!
সন্ধ্যাটা আবার গাঢ় অন্ধকার। একটানা ঝিঁ ঝিঁ’র ডাক। বিচিত্রসব পোকামাকড় আর প্রাণপ্রকৃতি মিলে খুব মায়াবী এক অকৃতিম- আদিম জীবন।
আমরা শহুরে মানুষ। সেই আদিমতার স্বাদ নিতে পাহাড়ে যাই। মাইলের পর মাইল হাঁটি। ঝিরি-ঝর্ণা আর শান্ত সবুজ পাহাড় দেখে চোখ জুড়িয়ে নেই। মন বলে, এ জীবনে আর কি কিছু প্রয়োজন আছে? পাহাড় ঘেরা এমন একটা জুম ঘর থাকলে এক জীবনে আর কি লাগে!
কিন্তু সমতলে বসে, দু’দিন পাহাড়ে ঘুরে যেমন পাহাড় বোঝার উপায় নেই, তেমনি যুগের পর যুগ যে মানুষগুলো দুর্গম পাহাড়ের সঙ্গে আছেন, তাদের জীবনযাপন এক পলকে জানতে চাওয়াটাও বাড়াবাড়ি।
পাহাড়ের দুর্গম পাড়ায় যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীটি আজ মা হতে চলেছেন তার চিকিৎসা, সন্তান জন্মদান কিংবা সন্তানটির বেড়ে ওঠা কেমন, তা কেবল সেই বাসিন্দারাই ভালো জানেন। দূরের চিকিৎসা কেন্দ্রে তিনি কেমন সেবা পান। সেবা নিতে আদৌ যেতে পারেন কি না। কীভাবেই বা পথটি পেরুতে হয় তাকে, সেই খবর কে রাখে!
যে শিশুটি আজ পাহাড় মাড়িয়ে স্কুলে যায়, যে শিশুর অভিভাবক শুধু দূরত্বের কারণে শিশুর লেখাপড়া চালিয়ে নিতে পারেন না, রাঙামাটির জুরাছড়ির দুর্গম দুলুপাড়ার সেই অভিভাবকদের কাছে শহুরে আমার পাহাড় ট্রাকিং কি বিলাসিতা? কে জানে!
শুধু শিক্ষা আর চিকিৎসাইতো সব নয়। মৌলিক চাহিদার বাকি উপাদানগুলোর কতটুকুই বা পূরণের সুযোগ আর সাধ্য আছে দূর পাহাড়ে- নিভু নিভু জ্বলতে থাকা কুপির আলোতে রাত পার করা মানুষের?
এইসব না থাকার কারণ নিয়ে হয়ত অনেক কিছুর দিকে ইঙ্গিত করা যাবে। কিন্তু সম্প্রতি রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি আর বান্দনবানের দুর্গম পাহাড়, সীমান্ত লাগোয়া পাহাড়িপাড়া আর জনপদগুলো ঘুরে আমার কাছে মনে হয়েছে নিরবিচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ না থাকাটাই এ অঞ্চলের মানুষের দুর্দশাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি কারণ।
বান্দরবান দেশের দরিদ্রতম জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম- এটিও এই যোগাযোগ ব্যবস্থার ঘাটতির কারণেই। যেখানে সড়কই নেই সেখানে কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা দোকানপাট গড়ে উঠবে কীভাবে! তবে দেরিতে হলেও আশার আলো ছড়াতে শুরু করেছে পাহাড়িপাড়ায়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগে পাহাড়ের পা ছুঁয়ে, গা বেয়ে নির্মিত হচ্ছে এক হাজার ৩৬ কিলোমিটার সড়ক। নাম তার ‘সীমান্ত সড়ক’। যার ব্যাপ্তি খাগড়াছড়ির রামগড় থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত!
তিনটি ধাপে নির্মাণাধীন সড়কটির প্রথম পর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে- ৩১৭ কিলোমিটার সড়ক। যার মধ্যে ইতোমধ্যেই ১৭৩ কিলোমিটার এখন- যান চালাচলের উপযোগী। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এই সড়ক তৈরীর পরিকল্পনা করলেও, তা বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড।
সড়কটির একপ্রান্তে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত আর অন্যপ্রান্তে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত। এসব তাত্ত্বিক কথা। কিন্তু মাঠের চিত্র টের পাওয়া যায় ওই ১৭৩ কিলোমিটার নির্মাণ হয়ে যাওয়া সড়কটিতে গেলে।
একটা সময় ছিল যখন পাহাড়ে শুধুই জুম চাষ করতেন জুমিয়ারা। এ জন্য পাহাড় পুড়িয়ে পাহাড়ের মাথা ন্যাড়া করে বানানো হতো জুমের জমি। সনাতনী এই প্রক্রিয়া পরিবেশের এতই ক্ষতির কারণ যে, যুগের পর যুগ ধরে ধ্বংস হচ্ছে একের পর এক পাহাড়। একটি পাহাড়ে যখন জুম চাষের কাজ চলে, সেখানে পরবর্তী কয়েক বছর আর কোনো গাছগাছালি জন্মায় না। তাই পাহাড়ের মানুষ পরের বছর অন্য কোনো পাহাড় জুম চাষের উপযোগী করেন। আবার পোড়ে পাহাড়, ধ্বংস হয় বিবিধ গাছগাছালি আর প্রাণপ্রকৃতি।
আসলে সনাতনী জুম চাষের কারণে পাহাড়ের বাসিন্দারাই ক্ষতির শিকার হন। এক সময় পাহাড়ের মানুষ শুধু তরকারির জন্য লবণ কিনতেন। বাকি সবই ফলতো পাহাড়ে। কিন্তু জুমের জমি নষ্ট করছে অন্য সব ফসলের উৎপাদন। ফলে পাহাড় হারিয়েছে তার উর্বরতা।
প্রকৃতির বড় ধরণের ক্ষতি না করেই অবশ্য এগিয়ে চলছে পাহাড়ে সড়ক তৈরির কাজ। তাই কেউ যদি সীমান্ত সড়কের কারণে পরিবেশের ক্ষতির দিকটি, গাছগাছালি কেটে ফেলার দিকটি নিয়ে কথা বলতে চান তবে তা ধোপে টেকে না। বরং জীবনমান বদলে যাচ্ছে ওই ১৭৩ কিলোমিটারের আশেপাশের জনপদে। যার তুলনামূলক আলোচনায় সড়ক তৈরীর পক্ষেই জোড়াল যুক্তি দেয়া সম্ভব।
সবুজ পত্র সবুজের সমারোহে বাংলাদেশ