রাজ ধনেশ

রাজ ধনেশ প্রকৃতির এক অপরূপ শোভা। সৌন্দর্যের প্রতীক। এদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অঙ্গ হচ্ছে লম্বা ঠোঁট। সারা দেহে সাদা-কালো ও হলুদ রংয়ের নয়নাভিরাম ছোপ। মানুষের মতোই এদের চোখের পাতার নিচে চুল রয়েছে। বাংলাদেশে এটি বিরল অথবা বিলীন হয়েছে; একসময় সম্ভবত সব মিশ্র চিরসবুজ বনেই রাজ ধনেশ বাস করতো। এখন চট্টগ্রাম এবং সিলেট বন বিভাগের গহিন বনে কোথাও দু’ একজোড়া চোখে পরে কালেভদ্রে। বাংলাদেশ ছাড়ারাও নেপাল, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় রাজ ধনেশ পাওয়া যায়।

এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম পাখিদের একটি। এর ঠোঁটের মাথা থেকে লেজের শেষ পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৯৫ থেকে ১০৫ সেন্টিমিটার, অর্থাৎ এরা আকৃতিতে শকুনের চেয়েও অনেক বড়। ওজন প্রায় ৩ – ৬ কিলোগ্রাম। এদের প্রকাণ্ড ঠোঁটটি নিচের দিকে বাঁকানো আর ঠোঁটের ওপরে আছে শিংয়ের মতো গঠন। আপাতদৃষ্টিতে এদের ঠোঁট অনেক ভারি মনে হলেও আসলে বেশ হালকা, কারণ ঠোঁট আর শিংয়ের ভেতর আছে অনেক ফাঁপা প্রকোষ্ঠ। এদের গায়ের পালক কালো, সাদা আর হলদে। কারো ডানার মাঝ বরাবর আছে লম্বা সাদা দাগ। আর সাদা লেজের শেষের দিকে আছে মোটা কালো ব্যান্ড, যা দেখে অন্যান্য ধনেশ প্রজাতি থেকে এদের সহজেই আলাদা করা যায়। বিশাল বড় এই পাখির মাথা, গলা, ঘাড় এবং বুকের উপরের অংশ হলুদ যেমন হলুদ মস্ত বড়, নিচের দিকে বাঁকানো ঠোঁট; উপরের ঠোঁট লালচে; ঠোঁটের বর্ম বড়, চ্যাপ্টা, প্রশস্ত এবং কপাল ঢেকে থাকে ও সামনে-পিছে দুটি করে দাগ; ঠোঁটের গোঁড়া, কপালের পাশ থেকে গলার ও থুতনি কালো; কালো ডানার কিনারা এবং মাঝ বরাবর আলাদা মোটা পট্টি; সাদা লেজের উপ-ডগায় বড় কালো বলয়; বর্মে আগে-পিছে কালো; বুক কালো; পেট, পা অবসারণী/চারপাশে এবং লেজের নিচের ঢাকনা পালক সাদা; চোখের তারা লাল; চোখের চারপাশের চামড়ার বলয় কালো; স্ত্রী পাখির বর্মে কালো রঙ নেই বললেই চলে; চোখের তারা সাদা এবং চারপাশের চামড়া লাল; আমাদের বনে উড়ে বেড়ানো এমন দ্বিতীয় প্রজাতি নেই।

রাজ ধনেশের বসবাস গহিন বনে। ধনেশ দারুণ ভাবে স্থান কালের উপর নির্ভর করে । একটি জোড়া একই এলাকায় আজীবন থাকে। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানুষ সৃষ্ট দুর্যোগের কারণে অনেক সময় বাধ্য হয়ে বাসা বদল করে। এরা খুবই শব্দ সৃষ্টির মাঝে বসবাস করে। খুব জোরে খক-খক-খক শব্দ করে ডাকে এবং ওড়ার সময় ডানা ঝাপটানোর শব্দও বেশ জোরে হয়।

পাখি নিধন আইনত নিষেধ। কিন্তু চোর না শোনে ধর্মের কাহিনী। অসাধু কিছু চক্র ধনেশ পাখি শিকার করে ‘ধনেশের তেল’ বিক্রি করে। এছাড়া পাহাড়িরা মাংস হিসেবে ধনেশ ধরে খায়। এমনকি প্রজনন কালে স্ত্রী-ধনেশ যে ডিমে তা দেয়, পাখি বিশেষজ্ঞ শরীফ খান জানান, ‘কুঠির ভেঙে ওই ডিমও পাহাড়িরা খায়।’ ফলে অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়েছে ধনেশরা। সারা দেশে তাদের সংখ্যা খুবই কম। যে কটা টিকে আছে, তা তাদের ‘নিজেদের যোগ্যতা’ বলেই। শরীফ খান বলেন, ‘আমরা তো তাদের বাঁচানোর জন্য কোনও উদ্যোগ নিচ্ছি না।’