আওয়ামী লীগ


১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৯ সালের গোড়ার দিকেই দলের ভেতরেই রক্ষণশীল এবং প্রগতিশীলদের মধ্যে বিরোধ চরম রূপ পরিগ্রহ করে। প্রগতিশীল অংশ ১৯৪৯ সালের জুন মাসের ২৩-২৪ তারিখে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (ইপিএএল) গঠন করেন। শেখ মুজিবুর রহমান এই দলের একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন এবং খোন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে যৌথভাবে দলের যুগ্ম সম্পাদক হন। ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (এপিএএল) প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৫৫ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত এ দলের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেয়া হয়। শুরু থেকেই এ দলটির ভেতর দুটি সুনির্দিষ্ট মতধারার অনুসারীদের উপদল ছিল; এর একটি ছিল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মার্কিনপন্থী ধারা এবং অপরটি ছিল মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গণমুখী বামপন্থী ধারা। এই মতপার্থক্যগত বিরোধ ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে দলটিকে আরও একটি ভাঙনের দিকে ঠেলে দেয়, যখন মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন।

১৯৬২ সালের ৪ অক্টোবর গঠিত ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের (এন.ডি.এফ) একটি অংশ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করতে থাকে। তবে ১৯৬৪ সালের ২৫-২৬ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দলের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় গৃহীত এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগকে পূর্ব পাকিস্তানে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। অবশ্য পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের পুনরুজ্জীবন ঘটে এর কিছু দিন আগেই। একই বছর মার্চ মাসে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত হলেও এটি একটি দলীয় ইশতেহার প্রণয়নে ব্যর্থ হয় এবং কার্যত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ একটি স্বাধীন সত্তা সম্পন্ন রাজনৈতিক দল হিসেবে এর কর্মকান্ড শুরু করে। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যকার বৈষম্যের বিষয়টি ইতিমধ্যেই বেশ কিছুসংখ্যক বুদ্ধিজীবী, বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ী/শিল্পপতিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর তেমন কোনো নেতার আবির্ভাব ঘটেনি যিনি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের দুই প্রাদেশিক অংশের মধ্যে যোগসূত্র রক্ষা করতে পারতেন। এই পটভূমিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক গতিধারা অনুধাবন করে ছয় দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন।

ছয় দফা কর্মসূচি ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে। কিন্তু শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয় এবং রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। এই পর্যায়ে মূখ্যত ছাত্রদের নেতৃত্বে সংঘটিত একটি গণঅভ্যুত্থানের মুখে সরকার মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানসহ মামলার অন্যান্য অভিযুক্তদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো নির্বাচনের এই ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকার করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে বাংলাদেশে সুপরিকল্পিতভাবে গণহত্যা শুরু করে। শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হয় এবং বন্দি হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাই দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান এবং ১৯৭১ সালের ৫-৬ জুলাই তারিখে দলের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাখা হয়। তাঁরা ইতিমধ্যেই ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের একটি অস্থায়ী সরকার গঠন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নতুন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করে। কিন্তু দেশের ক্রমাবনতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি এবং বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) নামের একটি দল গঠনের মাধ্যমে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত এক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের নির্মম হত্যাকান্ডের সাথে সাথে আওয়ামী লীগের এ অধ্যায়টির অবসান ঘটে।

১৯৭৬ সালে আওয়ামী লীগ নামে এ দলটি এর কর্মকান্ড পুনরায় শুরু করে। কিন্তু ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বহু ব্যক্তি এবং অনেকগুলো উপদল আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে পৃথক পৃথক দল গঠন করে, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে আতাউর রহমান খান কর্তৃক গঠিত জাতীয় লীগ (১৯৭০); জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ, ১৯৭২); জেনারেল এম.এ.জি ওসমানী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জাতীয় জনতা পার্টি (১৯৭৬); আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বাধীন গণ আজাদী লীগ (১৯৭৬) এবং খোন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বাধীন গঠিত বাংলাদেশ ডেমোক্র্যাটিক লীগ (১৯৭৬)।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকান্ডের পর আওয়ামী লীগ চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। আওয়ামী লীগের অবশিষ্ট নেতৃবৃন্দ দলত্যাগী গ্রুপ ও উপদলসমূহকে পুনরায় একত্রীকরণের মাধ্যমে এবং এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দলটিকে চাঙ্গা করে তোলেন। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ১৪০টি আসনের বিপরীতে এই দল ৮৮টি আসন লাভ করে। ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ১১৬টি আসনের বিপরীতে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে এবং এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে সমর্থন দেয়।