
সপ্তম দিনে পা দিল ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনি সশস্ত্র বাহিনী হামাসের সংঘাত। সংঘর্ষের ষষ্ঠ দিনে ইসরায়েলি সেনা জানিয়েছে, প্যালেস্তাইনের সশস্ত্র বাহিনী হামাসের সঙ্গে সংঘাতে এখন পর্যন্ত সে দেশের ১,২০০ নাগরিক মারা গিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২২২ জন সেনা। গাজার প্রশাসন জানিয়েছে, সেখানে মৃত্যু হয়েছে ১,৪১৭ জনের। হামাসের হামলার পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে ইসরায়েলও। ইসরায়েলের দাবি, ইতিমধ্যেই তারাও হামাস বাহিনীর ১৫০০ জনকে খতম করেছে। ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্রে আঘাতে গাজার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
গত ৭ অক্টোবর থেকে হামাসের সঙ্গে ইসরায়েল সেনা সংঘাতের সূত্রপাত। হামাসকে রুখতে সেনা গাজা ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে ইজরায়েলের সামরিক বাহিনী। তবে গাজায় প্রবেশ করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি বলেও ইসরায়েলি সেনা জানিয়েছে।
সংবাদ সংস্থা এএফপি-র সূত্র অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনার মুখপাত্র রিচার্ড হেচট বলেন, ‘‘আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব গাজায় প্রবেশের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা দেখার জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। এমনিতে আমরা গাজায় প্রবেশ করত প্রস্তুত।’’ গাজা বিশ্বের অন্যতম জনবসতিপূর্ণ এলাকা। সেই ভূখণ্ডে প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ বসবাস করেন। অন্য দিকে, ইসরায়েলে প্রতি বর্গকিলোমিটারে মাত্র ৪০০ জনের বাস।
গাজা ভূখণ্ড নিয়ে ফিলিস্তিন, ইসরায়েল এবং মিশরের মধ্যে চলতে থাকা দ্বন্দ্বের কারণে সেখানকার সাধারণ মানুষের জীবন এমনিতেই সমস্যায় জর্জরিত। সম্প্রতি শুরু হওয়া ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের কারণে গাজাবাসীদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
গাজা ভূখণ্ড ৪০ কিমি লম্বা এবং ৯.৬ কিমি প্রশস্ত একটি সঙ্কীর্ণ ভূখণ্ড যা পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর, উত্তর-পূর্বে ইসরায়েল এবং দক্ষিণে মিশর দ্বারা বেষ্টিত। গাজা ভূখণ্ডের মধ্যেই রয়েছে ফিলিস্তিনের বৃহত্তম শহর গাজা। ইসরায়েল থেকে কাঁটাতার দিয়ে বিচ্ছিন্ন গাজা ভূখণ্ড বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি। যা ওয়াশিংটনের আয়তনের প্রায় দ্বিগুণ। গাজার প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার বয়স ১৮ বছরের কম। দারিদ্রের হার ৫৩ শতাংশ। বিশ্বের অন্যতম জায়গা, যেখানে বেকারত্বের হার খুব বেশি। সেই গাজাতেই ঢুকে হামলা চালানোর চিন্তাভাবনা করছে ইজ়রায়েলি সেনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েলি সেনা স্থল এবং আকাশপথে গাজায় প্রবেশ করতে শুরু করলে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী সেই ভূখণ্ডের অলিগলিতে রক্তগঙ্গা বইবে। ভয়ঙ্কর যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হবে পুরো এলাকা জুড়ে। সঙ্কীর্ণ ওই ভূখণ্ডে বহু মানুষ মারা যাবেন। তবে অনেকেই আবার মনে করছেন, ইসরায়েলি সেনার পক্ষে গাজ়ায় প্রবেশ করে হামলা চালানো খুব একটা সহজ হবে না। এলাকার তুলনায় জনসংখ্যার ভার অনেক বেশি হওয়ায় গাজা ভূখণ্ডের ভবনগুলি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে। রাস্তাঘাট সরু।
অর্থাৎ, ইসরায়েলি বোমার হামলায় যদি গাজার বেশ কয়েকটি ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, তা হলে সেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হবে ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষে ধ্বংসাবশেষের উপর দিয়ে সাঁজোয়া গাড়ি বা ট্যাঙ্ক নিয়ে যাওয়া কঠিন হবে ইসরায়েল বাহিনীর। অন্য দিকে, হামাসের সশস্ত্র বাহিনী গাজা ভূখণ্ড হাতের তালুর মতো চেনে। তাই অলিতে-গলিতে ইসরায়েলের সেনার জন্য ফাঁদ পেতে রাখা তাদের জন্য খুবই সহজ হবে।
গাজা ভূখণ্ডের ‘গোলকধাঁধা’, সঙ্কীর্ণ রাস্তা-বাড়িঘরের কারণে স্নাইপারদের জন্যও হামলা চালানো খুব কঠিন হবে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। গাজায় প্রতি দিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। যুদ্ধ শুরুর পর তা আরও বেড়ে গিয়েছে। তাই অন্ধকারের মধ্যে ইসরায়েলের সেনা বিশেষ সুবিধা করতে না পারলেও বাজিমাত করতে পারে হামাস।
সিরিয়া এবং ইউক্রেনের যুদ্ধে দেখা গিয়েছে, কী ভাবে ছোট ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেট দিয়ে বড় পদাতিক বাহিনীকে তছনছ করা যায়। আর সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সহজেই গাজার বুকে ইসরায়েলের বিশাল বাহিনীকে বিপদে ফেলতে পারে হামাস। বিমানে করে গাজায় বিমানবাহিনী ঢোকানোও ঝুঁকিপূর্ণ হবে ইসরায়েলের জন্য। অন্তত তেমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
গাজার আকাশ ছোট। তাই সেখানে ইসরায়েলের যুদ্ধবিমানকে সহজেই চিহ্নিত করা সহজ হবে। হামাসের ক্ষেপণাস্ত্রের মোকাবিলা করতে হতে পারে বিমানগুলিকে। হামাসের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধরাশায়ী হয়ে যেতে পারে ইসরায়েলি বিমান। তবে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী গাজায় প্রবেশ করলে সমূহ বিপদের মুখোমুখি হতে হবে গাজার সাধারণ মানুষকে। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হবে গাজা।
সবুজ পত্র সবুজের সমারোহে বাংলাদেশ